ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে সারাদেশে ১৬ জনের মৃত্যু

ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের তাণ্ডবে সারাদেশে ১৬ জনের মৃত্যু

ডিএসএস,ডেস্ক: সারা রাত তাণ্ডব চালানোর পর ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ভোরের দিকে ঘূর্ণিঝড়টি স্থল-নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। তার আগে সুপার সাইক্লোন আম্পান কিছুটা শক্তি হারিয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় রূপে বুধবার দুপুরের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে আঘাত হানে। পরে সন্ধ্যায় আছড়ে পড়ে সুন্দরবনসহ বাংলাদেশের উপকূলে। আম্পানের তাণ্ডবে দেশের বিভিন্ন জেলায় কমপক্ষে ১৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে।

তাদের মধ্যে বরিশাল বিভাগের ভোলা জেলায় দুজন, পটুয়াখালীতে দুজন, পিরোজপুর তিনজন, বরগুনায় একজন এবং সন্দ্বীপে একজন, যশোরে তিনজন, সাতক্ষীরায় একজন, ঝিনাইদহে দুজন ও রাজশাহীতে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

আম্পানের প্রভাবে প্রবল বাতাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক ঘর-বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, গাছপালা ভেঙে পড়েছে। বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন উপকূলের ১০ লাখ গ্রাহক।

জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে ষোলজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

রাজশাহী

রাজশাহীর মোহনপুরে ঘূর্ণিঝড় আম্পানের মধ্যে আম কুড়াতে গিয়ে মনোয়ারা বেগম (৪২) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি উপজেলার হরিদাগাছি গ্রামের বারুইপাড়ার ইসহাক আলীর স্ত্রী। বুধবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে বাড়ির পাশে আম গাছের নিচে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের সদস্যরা। তিনি করোনা সতর্কতায় হোম কোয়ারেন্টিনে ছিলেন।

মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানওয়ার হোসেন জানান, ‘আম কুড়াতে গিয়ে মারা যাওয়া নারীর মেয়ে কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে ফেরেন। তার নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে এবং তাদেরকে কোয়ারেন্টিনে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাক আহম্মেদ বলেন, ‘তার শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। কোনো গাছ বা গাছের ডালও ভেঙ্গে পড়েনি। কীভাবে তিনি মারা গেছেন তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’

সাতক্ষীরা

ঘূর্ণিঝড় আম্পানে সাতক্ষীরা সদরে গাছ ভেঙে পড়ে এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে।

জেলা প্রশাসক এসএম মোস্তফা কামাল বলেন, বুধবার সন্ধ্যার পর জেলা শহরের কামালনগরে আমগাছ গাছ ভেঙে পড়ে ওই গৃহবধূর মৃত্যু হয়।

যাশোর

ঝড়ের মধ্যে রাত ১০টার পর যশোরের চৌগাছা উপজেলার চাঁদপুর গ্রামে ঘরের ওপর গাছ ভেঙে পড়ে এক মা ও তার শিশু কন্যার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধি।

চাঁদপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য শাহিনুর রহমান জানান, রাতে প্রবল বাতাসে একটি জাম গাছ ভেঙে ওই পরিবারের কাঁচা ঘরের ওপর পড়ে।

তাতে মা খ্যান্ত বেগম (৪৫) ও মেয়ে রাবেয়া (১৩) ঘটনাস্থলেই মারা যান এবং ছেলে আল-আমিন (২২) আহত হন বলে শাহিনুর রহমান জানান।

এদিকে রাত ১১টার দিকে শার্শায় ঝড়ের মধ্যে গাছ চাপা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে।

উপজেলার বাগআচড়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর টেংরা ওয়ার্ডের ওয়ার্ডের সদস্য মুজাম গাজী জানান, টেংরা গ্রামে ঝড়ে গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়লে মুক্তার আলি নামে ৬৫ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তিনি এলাকায় নসিমন চালাতেন।

ঝিনাইদহ

ঝিনাইদহে রাতে ঝড়ের মধ্যে ঘরের উপর গাছ ভেঙে পড়ে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ।

তিনি বলেন, রাত ১০টার পর ঝড়ের দাপট বাড়লে সদর উপজেলায় হলিধানী গ্রামে একটি গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে নাদিরা বেগম নামে ৫৫ বছর বয়সী ওই নারীর মৃত্যু হয়।

ভোলা

ভোলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে পড়ে রামদাসপুর চ্যানেলে ৩০ যাত্রীসহ একটি ট্রলার ডুবে রফিকুল ইসলাম নামে একজন নিহত হয়েছে। তার বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মনিরাম এলাকায়।

বিষয়টি নিশ্চিত করে ইলিশা ফাঁড়ির ইনচার্জ রতন কুমার শীল জানান, ওই ব্যক্তিসহ ৩০ যাত্রী ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসেন। তারা লক্ষ্মীপুর জেলার মজুচৌধুরী ঘাট থেকে ট্রলার যোগে মেঘনা নদী পাড়ি দিয়ে ভোলায় আসে। ওই ট্রলার রাজাপুর সুলতানীঘাটের কাছে এলে ট্রলারটি ডুবে যায়। ওই সময় স্রোতের টানে ভেসে যান রফিকুল ইসলাম। পরে তার লাশ উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।

এদিকে, চরফ্যাশন উপজেলায় সিদ্দিক ফকির (৭০) নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন। বুধবার সকাল ৯টার দিকে উপজেলার দক্ষিণ আইচা থানার চর কচ্ছুপিয়া এলাকার রেইনট্রি গাছ ভেঙে মাথায় পড়ে সিদ্দিক ফকির আহত হন। তাকে তাৎক্ষণিক চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল হাসপাতালে পাঠায়। পথেই তার মৃত্যু হয়।

পটুয়াখালী

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রভাবে পটুয়াখালীতে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে গলাচিপা উপজেলায় রাশেদ (৬) নামে এক শিশু ও কলাপাড়ায় শাহ আলম নামে সিপিপি’র এক কর্মীর মৃত্যু হয়েছে।

গলাচিপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম জানান, সন্ধ্যায় গলাচিপা উপজেলার পানপট্টি এলাকায় ঝড়ে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ছয় বছরের শিশু রাশেদ মারা গেছে।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ জানান,পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলায় জনগণকে সচেতন করতে গিয়ে মো. শাহ আলম মীর (৫৫) নামে একজন ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল ১০টার দিকে উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নে খেয়া পার হওয়ার সময় পানিতে পড়ে তিনি নিখোঁজ হন। পরে সন্ধ্যায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।

পিরোজপুর

সুপার সাইক্লোন ‘আম্পান’ এর কারণে পিরোজপুর জেলায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় শুরুর পরে জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলায় দুজন এবং ইন্দুরকানী উপজেলায় একজন মারা গেছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জেলা দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মোজাহারুল ইসলাম।

নিহতরা হলেন- মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান মোল্লা (৫৫) ও মঠবাড়িয়া উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামে মৃত মুজাহার বেপারীর স্ত্রী গোলেনুর বেগম (৭০) এবং ইন্দুরকানী উপজেলার উমিদপুর এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম (৫০)।

জেলা দুর্যোগ ও ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. মোজাহারুল ইসলাম জানান, বুধবার সন্ধ্যার পরে মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের গিলাবাদ গ্রামের শাহজাহান মোল্লা শহরের কলেজের পেছনে বাসায় যাওয়ার পথে দেয়াল ভেঙে তার ওপর পড়ে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ছাড়া মঠবাড়িয়া উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের ধুপতি গ্রামের বিধবা গোলেনুর বেগম ঘূর্ণিঝড়ের ভয়ে বুধবার সন্ধ্যায় নিজের ঝুঁকিপূর্ণ ঘর থেকে পাশের হাসিবুর রহমানের ঘরে যাওয়ার পথে বাতাসের তীব্রতায় পা পিছলে পড়ে ঘটনাস্থলে মারা যান।

অপরদিকে, রাতে জেলার ইন্দুরকানী উপজেলার উমিদপুর গ্রামে শাহ আলমের বাড়িতে পানি প্রবেশ করলে ঘরেই আতঙ্কিত হয়ে স্ট্রোক করে তিনি মারা যান।

বরগুনা

বরগুনার সদর উপজেলার আশ্রয়কেন্দ্র যাওয়ার পথে এক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী ‘অসুস্থ হয়ে’মারা গেছেন।

শহীদুল ইসলাম নামের ৬৪ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। পরীরখাল বাজারে রেস্তোরাঁ চালাতেন তিনি।

বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা আক্তার জানান, শহীদুল আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন।

উপজেলার এম বালিয়াতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহনেওয়াজ সেলিম জানান, এ ইউনিয়নের পরীরখাল মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে শহীদুল ইসলামের মৃত্যু হয়।

“আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার পথে হৃদরোগে ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।”

সন্দ্বীপ

নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে আম্পানের প্রভাবে আসা জোয়ারের পানিতে তলিয়ে মৃত্যু হয়েছে মো. সালাউদ্দিন (১৮) নামে এক যুবকের। বুধবার দুপুরে সন্দ্বীপ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। সন্দ্বীপ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সোলাইমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, উপকূলে ঘাস কাটতে গিয়ে ওই যুবক জোয়ারের পানিতে পড়ে যান। পরে স্থানীয়রা তার মরদেহ উদ্ধার করে।

ডিএসএস/এমএম